হিজামা: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও আধুনিক বিজ্ঞানের বিস্ময়কর সমন্বয়:
আপনি কি জানেন, হাজার বছর ধরে প্রচলিত একটি প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি আজও সমানভাবে কার্যকর এবং আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) এটি নিজে করতেন ও করতে উৎসাহিত করতেন? এর নাম হলো হিজামা বা কাপিং থেরাপি (Cupping Therapy)। এটি শুধু একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, বরং ইবাদত ও সুন্নাহ পালনের একটি মাধ্যমও বটে।
১. হিজামা কি? (What is Hijama?)
হিজামা হলো একটি প্রাচীন থেরাপি, যেখানে শরীরের নির্দিষ্ট কিছু অংশে কাপ বা মগ স্থাপন করে হালকা ভ্যাকুয়াম বা শূন্যতার সৃষ্টি করা হয়। এর ফলে ত্বকের নিচে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। মূলত দুই প্রকারের হিজামা প্রচলিত:
- ড্রাই কাপিং (Dry Cupping): শুধু কাপ স্থাপন করে ভ্যাকুয়াম তৈরি করা হয়, রক্ত বের করা হয় না।
- ওয়েট কাপিং (Wet Cupping): কাপ স্থাপনের আগে ত্বকে ছোট ছোট সূক্ষ্ম আঁচড় বা চিরা দেওয়া হয়, যার মাধ্যমে দূষিত রক্ত বা টক্সিন বের হয়ে আসে।
২. কুরআন ও হাদিসে হিজামা:
হিজামা যে একটি বরকতময় চিকিৎসা, তার প্রমাণ সরাসরি হাদিসে পাওয়া যায়:
রাসূলুল্লাহ (সা.) এর বাণী:
আনাস ইবনে মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমাদের চিকিৎসার জন্য যেসব জিনিস ব্যবহার করো, তার মধ্যে হিজামা হলো সর্বোত্তম।” (বুখারী ও মুসলিম)
তিনি আরও বলেছেন: “মিরাজের রাতে আমি ফেরেশতাদের যে কোনো দলের পাশ দিয়ে গিয়েছি, তারাই আমাকে বলেছে: ‘হে মুহাম্মদ! আপনি আপনার উম্মতকে হিজামা করার নির্দেশ দিন’।” (তিরমিযী, ইবনে মাজাহ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে হিজামা করাতেন: বিভিন্ন হাদিস থেকে প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও মাথাব্যথা, পায়ের ব্যথা এবং যাদুর চিকিৎসার জন্য হিজামা করিয়েছেন।
৩. হিজামার বিস্ময়কর উপকারিতা (Benefits of Hijama):
আধুনিক গবেষণাতেও হিজামার অসংখ্য স্বাস্থ্য উপকারিতা প্রমাণিত হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলো:
- শরীর থেকে বিষাক্ত পদার্থ দূর করা: হিজামা রক্ত থেকে বিষাক্ত উপাদান (Toxins) এবং দূষিত রক্ত (Stagnant Blood) বের করে শরীরকে পরিশোধিত করে।
- ব্যথা উপশম: মাথাব্যথা, মাইগ্রেন, ঘাড় ও পিঠের ব্যথা, জয়েন্টের ব্যথা এবং পেশী ব্যথায় এটি অত্যন্ত কার্যকর।
- রক্ত সঞ্চালন উন্নত করা: এটি শরীরের রক্ত প্রবাহকে উদ্দীপিত করে এবং অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেন ও পুষ্টি সরবরাহ বৃদ্ধি করে।
- রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি: নিয়মিত হিজামা দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করতে সাহায্য করে।
- স্ট্রেস ও উদ্বেগ হ্রাস: শরীরের এন্ডোরফিন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক।
- হজম উন্নত করা: হজমজনিত সমস্যা যেমন কোষ্ঠকাঠিন্য এবং আইবিএস (IBS) থেকে মুক্তি দিতে পারে।
- ত্বকের স্বাস্থ্য: ব্রণ, একজিমা এবং অন্যান্য ত্বকের অবস্থার উন্নতিতে সহায়ক।
- উর্বরতা বৃদ্ধি: কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এটি পুরুষ ও মহিলা উভয়ের উর্বরতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
৪. কখন হিজামা করানো উত্তম?
হাদিস অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট দিনে হিজামা করানোকে অধিক বরকতময় ও উপকারী বলা হয়েছে।
- চন্দ্র মাসের ১৭, ১৯ ও ২১ তারিখ হিজামার জন্য উত্তম। (তিরমিযী)
- সোমবার, মঙ্গলবার এবং বৃহস্পতিবার হিজামা করানো মুস্তাহাব।
তবে, প্রয়োজনে যেকোনো দিন হিজামা করানো যায়।
৫. হিজামা কি নিরাপদ? (Is Hijama Safe?)
যদি একজন প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ থেরাপিস্ট দ্বারা পরিষ্কার এবং জীবাণুমুক্ত সরঞ্জাম ব্যবহার করে হিজামা করানো হয়, তবে এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ। তবে, গর্ভবতী নারী, রক্তক্ষরণজনিত সমস্যা আছে এমন ব্যক্তি, দুর্বল স্বাস্থ্য বা রক্তশূন্যতায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত বা চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপসংহার:
হিজামা শুধুমাত্র একটি চিকিৎসা পদ্ধতি নয়, এটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্য লাভ করা যায়, তেমনি অন্যদিকে সওয়াবও অর্জন করা যায়। আসুন, আমরা এই বরকতময় সুন্নাহকে আমাদের জীবনে ফিরিয়ে আনি এবং সুস্থ জীবনযাপন করি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সুন্নাহ পালনের তাওফিক দিন। আমিন।


